Header Border

ঢাকা, বুধবার, ৬ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) ২৯.৯৬°সে

করোনাকালের করুণা || আশরাফ আলী চারু

Spread the love

সাইবালীর কথা কে না জানে। আমতলা বা ডুমুরতলা যেখানেই লোকজন একত্র হোকনা কেন সেখানেই সাইবালীর আলোচনা। পাট নিড়ানি বা ইরি কাঁটার কামলা-গৃহস্ত সবার মুখে মুখেই একই কথা সাইবালী ভাই সবার প্রিয় একজন মানুষ।
মা বাবার একমাত্র ছেলে ছিলেন সাইবালী। মা-বাবার আদুরে মানিক ধনের প্রকৃত নাম মোঃ সাহেব আলী। ছোটবেলায় নাদুসনুদুস সাস্থ্য ছিলো বলে দাদী নানীরাও সাহেব ভাই বলে ডাকতেন। মা-বাবার খুব আশা ছিলো পড়ালেখা করে বড় চাকুরে হবে সাহেব আলী। চাকুরে সাহেব আলীকে সকলেই সাহেব সাহেব করে মুখেমুখে রাখবেন। সকলেই মুখেমুখে রেখেছেন ঠিকই তবে বড় কোনো চাকুরে বা বড় সাহেব হিসেবে নয়-সাইবালী হিসেবে। একেবারে আমজনতার অন্তরে অন্তরে এ নাম।
বাবা মা’র আশানুরূপ লেখা পড়া করতে পারেনি সাইবালী। সরকারি চাকুরেও হতে পারেননি তিনি। পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে ত্রিশ বিঘা জমি তিনি শেষ করেছেন মানুষের জন্য। সামাজিক কর্মকান্ড তার নেশা হয়ে পড়েছিলো বলে। মইমেলা, নৌকাবাইচ,ঘুড়ির মেলা,হাডুডু খেলা, ফুটবল খেলা সহ হাল আমলের জনপ্রিয় ক্রিকেট খেলায়ও প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে দেদারসে জমি বিক্রি করেছেন তিনি। কখনো হেরেছেন কখনও জিতেছেন। কিন্তু মানুষের মন হতে একদন্ড সরে যাননি তিনি। এখন সব জমি বিক্রি করে নিঃস্ব সাইবালী পরের জমিতে কাজ করেন। কিন্তু তারপরও মানুষের মন হতে একটুও নড়চড় হয়নি তার নামের।
গত দু’মাস হতে পৃথিবীজুড়ে নতুন এক আতংকের নাম করোনা। এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ায় সারাটা পৃথিবী থমকে গেছে। থমকে গেছে সাইবালীদের জীবন যাত্রা। গ্রামে ধান কাঁটার কাজ শেষ হয়েছে। সামান্য পাট আবাদের নিড়ানি কাজও শেষ। এখন গ্রামে কোনো কাজ নেই। আগে এ সময়টাতে গ্রামে কাজ না থাকলে অনেকেই শহরে চলে যেতেন। উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

হাল আমলের করোনার এমন পরিস্থিতিতে শহরেও কাজ পাওয়া দূস্কর। গাড়ি বন্ধ। যাতায়াত ব্যাবস্থা নাজুক। সব মিলিয়ে জনগনের অন্তর জুড়ে থাকা সাইবালীর নির্বাক হওয়ার অবস্থা। সংসারে নিঃসন্তান সাইবালীর গৃহিণী ছাড়া কোন মানুষ নেই। দৈনিক উপার্জন আর একটা গাভী ছাড়া আর কোনো সম্বলও নেই তাদের। গাভীর বাছুরটি বিক্রি করে কদিন আগে জমিলা নামে এক মৃত ফকিন্নির মিলাদ দিয়েছেন তিনি। জমিলা নিঃসন্তান ছিলেন বলে তিনি এ কাজটি করে সামাজিকতা রক্ষা করেছেন। এখন শেষ সম্বল গাভীটি এ দুঃসময়ে বিক্রি করে কদিন চলতে পারবেন এটাই চিন্তার বিষয়। স্ত্রীর সাথে রাতে পরামর্শ করলেন-যেহেতু কাজ কাম নেই গাভীটি বিক্রি করে দুঃসময় পার করা যাক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে এক ব্যাবস্থা করা যাবে। স্বামীর সিদ্ধান্তে অমত নেই স্ত্রীর। আগেও কোনোদিন অমত করার দুঃসাহস দেখাতে পারেননি তিনি। বন্ধা হিসেবে স্বামীর ঘর উজ্জ্বল করতে পারেননি বলেই স্বামীর মন ভাঙতে চাননি কোনদিন । স্বামীর ইচ্ছে মতোই সব হয়েছে এই সংসারে। তবে এতটা অধঃপতন হবে এটা ভাবতে পারেননি কখনও । স্বামী সাইবালী ভেবেছেন কিনা সেটা তিনিই ভালো জানেন।

বাজারে গরু বিক্রি করার জো নেই। বাজারগুলো লকডাউন। বাধ্য হয়েই গাভীটি বাড়িতেই বিক্রি করে দিলেন তিনি। গ্রামবাসী প্রতিবেশী অনেকেই বললেন, গরুটা বিক্রি করে সাইবালী ভাই কমপক্ষে দশ হাজার টাকা ঠকলেন। সাইবালীর এক কথা আমার যা হক আমি তাই পেয়েছি। ওরা জিতে থাকলে ওটা ওদের হক।

সপ্তাখানেক পরের ঘটনা। জামালপুরের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের এক লোক এসেছিলো সাইবালীদের গ্রামে। লোকটা ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত এমনটা মনে হয়নি সাইবালীর কাছে। লোকটার কথা গ্রামের সবাই বিশ্বাস করেছিলেন। লোকটা তার স্ত্রীর চিকিৎসা করার জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। যে যার মতো সহযোগিতা করেছিলেন। সবচেয়ে বড় সহযোগিতাটা করেছিলেন সাইবালী। একমাস চলার মতো খরচের টাকা হাতে রেখে সব টাকা দান করে দিয়ে ছিলেন লোকটাকে।
দুদিন পরে জানা গেলো লোকটা সত্যই বিপদে পড়ে টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। সে সংগৃহীত টাকা দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসাও করিয়েছেন। খবরটা শুনে সাইবালী যতটা আত্মতৃপ্তি পেয়েছেন তারচেয়ে বেশি আত্মতৃপ্ত হয়েছেন গ্রামবাসী। ধন্যধন্য করেছেন সাইবালীকে। এই না হলে বাপের বেটা!

গত দু’দিন হতে সাইবালীর শরীরটা ভালো নেই। সাধারণ ফ্লু নাকি করোনা ভাইরাসের আক্রমণ তা পরীক্ষা করা হয়নি। এই দুঃসময়ে জ্বর মাথা ব্যাথা শুরু হওয়ার সাথে সাথে সে ঘরে অবস্থান করছে। অসুখের কথা কাউকে সে বলেনি। সবাই যখন করোনার ভয়ে আতংকিত তখন এই সময়ে গ্রামবাসীদের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তার বাড়িটি গ্রামের একপ্রান্তে এবং আশেপাশে আর কোন বাড়িঘর না থাকায় কেউ জানলওনা সে খবর। সাইবালী স্ত্রীকে বলে দিয়েছেন কাউকে না বলার জন্য। স্ত্রীও কাউকে বলেননি। ফলে ডাক্তার দেখানোও হচ্ছেনা সাইবালীর। তৃতীয় দিনের দিন রাতে সাইবালী সংজ্ঞা হারালেন। স্ত্রী জ্ঞান ফিরানোর জন্য মুখে পানি ছিটালেন, হাতে পায়ে ধরে ঝাকাঝাকি করলেন,তেল মালিশ করলেন কিন্তু জ্ঞান ফিরাতে পারলেন না তার। নিরুপায় হয়ে সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী আহাদ আলীর বাড়ি যে বাড়িটি কোয়ার্টার কিলোমিটার দূরে সে বাড়ি গিয়ে আহাদ আলীকে সব খোলে বললেন। আহাদ আলীর বউ সাইবালী ভাইয়ের করোনা হয়েছে বলে আহাদ আলীকে যেতে বারন করলেন। আহাদ আলীরও আর যাওয়া হলোনা। সাইবালীর স্ত্রী একবুক হতাশা আর কষ্ট নিয়ে ফিরে এলেন। ঘরে ফিরে স্বামীর পায়ে পড়ে কাঁদলেন। মাথায় পানি দিলেন। যতটুকু পারেন কোরান তেলাওয়াত করে স্বামীর সারা শরীরে ফুঁ দিলেন।
সে জানে আহাদ আলীর বাড়িতে বলে আসা এখবর এতক্ষণে হয়তো সারা গ্রাম ছড়িয়ে পড়েছে। সুতারাং এ বড়ির দিকে সহজেই কেউ আর মুখ ফিরাতে চাইবেনা। করোনা কালের এই সময় সবাই যার যার মতো করে থাকতে চাইছে, বাঁচতে চাইছে। কেউ কারুর প্রতি সামান্য দরদটুকু দেখাচ্ছেনা। অসুস্থ লোকের ধারে কাছে যাচ্ছেনা কেউ। মৃতের জানাযায় লোক হচ্ছে-না। তাই চোখভরা জল আর অসহায়ত্বের একবুক কষ্ট নিয়ে অসুস্থ সংজ্ঞাহীন স্বামীর পাশে বসে একটি করোনামুক্ত সকালের অপেক্ষায় রইলেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ছড়া : সাহিত্যের মাঠে সবচেয়ে দুরন্ত খেলোয়াড়
লেখক-ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান আর নেই
বিশ্বের প্রথম ভার্চুয়াল ছড়া উৎসবে অংশ নিচ্ছেন যারা
সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী’র ৬০ তম জন্মদিন আজ
শিশুসাহিত্য পুরস্কারের জন্য পাণ্ডুলিপি আহবান করেছে ‘পাপড়ি’
চলে গেলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক দেবেশ রায়

আরও খবর

Design & Developed BY PAPRHI-iT