Header Border

ঢাকা, বুধবার, ৬ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) ২৯.৯৬°সে

চিঠি গদ্যে || সালেহ আহমদ খসরু

Spread the love

প্রিয় চিঠি,
কেমন আছ তুমি! আজ কেউ তোমাকে চিঠি দেয়না বলে আমার ভীষণ অভিমান!
জানো!- তোমার আগমনী কতো আনন্দ সুখদুঃখ উল্লাস উচ্ছ্বাস বেদনা যন্ত্রণা কাব্য আর মহাকাব্য জড়িয়ে থাকতো!
তুমি নেই- আজ ভার্চুয়ালের উদাম উদ্দামতায় কতো প্রেমিক তাঁর ছন্দ গান ছড়া পদ্যে গদ্যে আর হারিয়েছে কবিতার অঞ্জলি! কতো গেরুয়া বসন ধূসররঙের
কোরা কাগজে রুপান্তর হয়েছে, তা-কি তুমি জানো!!?

চিঠি,
কতো বিনিদ্র রজনী বালিশে মুখ গুঁজে আলবেলা ভোরের আকাশ ছুঁয়েছে- তা জানো!
সকালের সোনা রোদ পড়ে গিয়ে তীব্র দুপুরে ডাকহরকরা কড়া নাড়তেই হুমড়ি খেয়ে কতো বিকেল অলস কেটেছে তুমি আসোনি বলে!
সে খবর কোন পত্রিকার তাজা হরফ এখন
আর রঙ ছড়ায়না, তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে-কলেজের শিমুল তলে জম্পেশ আড্ডায় হয়ে উঠতে বাসন্তিকা!
কে পেয়েছে তোমায় কে আজও ছুঁয়ে দেখেনি তোমার রূপ রস সুধা-
তাই নিয়ে সেকি মাতম আর উচ্ছ্বাস,তা-কি তুমি জানো!

চিঠি-
তুমি আসবে বলে খলিল স্যারের বাংলা ক্লাস সেই দুপুরের খরতাপেও কানায় কানায় পুর্ন হতো
শুধু তোমার শব্দকোষ ছিনিয়ে নিতে!
বিকেলের সোনা রোদে তিন-চারের সারি সারি পরীদের পদযুগলের দোদুল দোলা কতো কি
তাই নিয়ে রাতে হয়তো ফাউন্টেনপেন ভাসিয়ে দিত-একটি শব্দ মালার তরে! তা-কি জানো!
কতো-শতো কষ্টে শেষে নিস্পৃহ যন্ত্রণায় তার অসাড়তা প্রকাশ করে বলতে -বন্ধু, একটি চিঠি দিবি!
আমি তাঁকে দিব!
তারপরে শর্ত জালে বেঁধে রেস্তোরাঁর কাবাব আর কয়লা রুটির সাবাড় শেষে ছাই ভস্ম থেকেই
যে ফিনিক্স পাখির জন্ম হতো সে আজ কতোদুর,
তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে ছাত্রাবাস এর সীতল কাকা কতো জনের মামা ডাক শুনতে কাঁতর ছিলো-
সে কথা কি বলে কেউ আজ!
তুমি যদি একটু হেলায় ভিন্ন হাতে সঁপতে এদিক-সেদিক তাই নিয়ে কতো সব খুনসুটির গল্প কি আজ রেস্তোরাঁয় বুন্দিয়া খেতে রসের হাড়ি ভাঙতে ভাঙতে- নিজের হাঁড়ি হারায়!
সেকথা বলেছে কোন সখা সখি! তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে দিন ছ’টি পার হলেই ছটফটিয়ে উঠতো কতো ব্যকুল চিত্ত
পক্ষ যদি বয়ে যেত মাসের পানে ধেয়ে উথাল আকুল হৃদয় ঝড়ের আভাস মিলছে বলে জানতে চাইতো- সঙ্কেত খানি কতো!? তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে বাশের মন্ডে সাদা হয়ে কালো শব্দে এটম কিংবা নাপাম বোমায় হতাহত কতো! তার খোঁজ রাখোনি একবারও!
তুমিতো এই খোঁজ নিয়েছ বলে কেউ আজ বলেনা,জিজ্ঞেস করেনা কতো অশ্রু নদী হয়েছে!
তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে ক্যান্টিনে চা’য়ের কাপে চুমুক দিতে ঠোঁট পুড়েছে কতো যুগল
সে খবর রাখতে তুমি!
হ্যাভারস্যাক বা ব্যাগের বালাই না-ই ছিলো, কিন্তু তুমি ছিলে আদর করে বইয়ের পাতায়-মুখ লুকিয়ে লজ্জায় ইতস্তত! তবুও তোমায় রক্ষে পক্ষে অভাব হতোনা, তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে রাতজাগা পাখিরা কতো সুর তোলে গান ধরেছে, কতো কাঠালিয়া দুপুর সন্ধ্যাতারায় বিলীন হয়েছে-কতো ঝিঁ-ঝিঁ পোকা জোনাকির আলোয় কেঁদে উঠেছে, কতো পেঁচা অলক্ষুণে ডাকে অস্থির তোলপাড় করেছে-কতো নিশিযাপন অমানিশার অন্ধকারে অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে, কতো রজনী সজনী হয়ে তার সব সাজ মুছে ফেলে ভোরের আকাশ রক্তিম করেছে,কতো সকাল শব সংবাদ হয়ে চিঠি হয়েছে-
তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে পিতার শ্রমে ঘামে পাঠানো মনিঅর্ডার প্রিয়তমার রুমালের চেয়েও সুগন্ধি মনে হতো, ঘি-রঙ মাখা শাপলা ফুলের খাম-খানি মনে হতো জগতের খাঁটি ঘি, আর শাপলা ফুল চকচকিয়ে আঁখি কোণে জমিয়ে দিত দুই ফোঁটা মুক্তো মানিক, টস করে যদি পড়তো বুকে তখন অস্ফুটস্বরে আওয়াজ দিতে –
মা মা’গো, তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে কতো অপেক্ষার অষ্টপ্রহর কাটিয়েছি দুর্নিবার দহনে, একবার মুর্খের মতো তোমাকে খোলা হয়েছিল বলে অনাহুত অনিচ্ছায় ভিন্ন এক আপনজন-
সেদিন ভাঁজের পরতে কি ছিলো লুকানো সুখ দুঃখের মহাকাব্য তা আজও জানিনি! তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে কন্যা জায়া জননী কতো স্বপন গুনে গুনে শুনিয়েছে কল্পকাহিনির পুঁথি পাঠ
তাঁর সোনামণিদের কতো রাজর্ষী কথন,
কর্তা মশাই একখানা খাম এনে দিয়ে রেখে দিতেন পালঙ্কের পাস ঘেঁষে- আমার আনত নয়ন কতোবার আঁছড়ে পড়েছে হাত বাড়াবার আগেই,
তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে বিদ্যাপীঠ শেষে কতো খাম পৌঁছে যেত তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় একটি সোনার হরিণ ছুঁবে বলে, দু-চাকার প্যাডেল এর টুংটাং শব্দে মা’য়ের উচ্চকিত নয়ন বাঁকা করে
ডাকতেন- খোকা, পিয়ন এসেছেন দেখ্তো কি-
সে-ই জিজ্ঞাসা কতো উৎকন্ঠিত ভাবনার জীবন দর্শন তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আসবে বলে কতো অঙ্গনা তাঁর করভূষণ সাঁটিয়েছে লাল হরিৎ হলুদ নীল কতো বাহারি রঙে,তোমার নীল খামের সুগন্ধি নীলাম্বরীতে কুঁচির ভাজে ভাঁজে কতো যে উদ্দামতায় লুটিয়েছে, অশুভ হুতুম পেঁচা অলক্ষুণে বার্তা পাঠিয়ে দ্বিপ্রহরের ডাক হরকরা অলস বিকেলকে রোলের মাতম করেছে কতো, তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
সুকান্তের “রানার ছুটেছে হাতে লন্ঠন—“সে গল্প নাড়িয়েছে বিশ্ব মানচিত্র! অথচ কতো দু-চাকা রাবার তপ্ত দুপুরে ক্ষয়িষ্ণু করে পৌঁছে দিয়েছেন একটি সংবাদ-প্রেম বিরহ নিয়োগ মৃত্যু আগমনী বার্তা, তা-কি তুমি জানো!
“চিট্ঠি আয়িহে” গানটি তোমার মনে আছে চিঠি ! কতো লক্ষ-কোটি কেঁদেছে তোমার সুরের মূর্ছনায়,
তা-কি তুমি জানো!

চিঠি,
তুমি আজ নেই বলে গ্রাম্য ষোড়শী নব বধু লুকিয়ে পুকুর ঘাটে আঁচলের ফাঁক গলে বের করে নিয়ে আসেনা কোন মহাকাব্য
বরই গাছের ডালের ফাঁকে এক ফাঁলি চাঁদের ঝিলিক তার ঠোঁটের আঁচর কাটা হাসির তোড়ে আর ভাসেনা কোন নয়নতারা –
সন্ধ্যাতারায় প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁর নিভে যাওয়ার কথা পৌঁছে যায়না শহুরে মেস নচেত হলের দখিনায়-
তাকি তুমি জানো!

চিঠি,
আজও তোমার একটি চিঠি আসবে বলে দখিনা খুলে রেখেছি!৷ মোহনিয়া বাঁশির সুরের মূর্ছনায় কতো লুটোপুটি খাও তাঁ-কি জানি আজ-
শুধু তুমি নেই বলে!
কদম গাছে শতো ফুল রক্ত জবা শিউলি কতো ঝরে পড়েছে সে খবর পাইনি- হাস্নাহেনার রাতে পুর্নিমার লুটোপুটি সে-ও রইলো অজানা-
শুধু তুমি নেই বলে!
পেয়ারা গাছে দুষ্ট বালক- আম কুড়ানোর বৈশাখী হাওয়ায় আঁচল উড়ানোর কবিতা
পড়িনা কতো মহাকাল-শুধু তুমি নেই বলে!
শাপলা সালুক তুলতে পেরে সাপের ছিটকে পড়ার আতঙ্কে শিউরে উঠার ছোট গল্প কান পাতিনা-
শুধু তুমি নেই বলে!

প্রিয় চিঠি,
শুধু তুমি আসবে বলেই আজও ঝড়বৃষ্টি দমকা হাওয়ায় নয়তো দ্বিপ্রহরের ঝাঁজালো উনুন কিংবা শান্ত বিকেলের আলোছায়ায় অপেক্ষার অষ্টপ্রহর
আজও থেমে নেই, বসে নেই সন্ধ্যা তাঁরা-
নিয়ন বাতির আলো-আঁধারিতে নিশুতি রাতের সপ্তর্ষি এসে এ-ই বলে গেল কয়ে যায় চুপিচুপি
অযুত নিযুতে নয়-
ভোরের শেষে আমায় মিষ্টি সকাল এসে
আলতো পায়ে বলবে-
প্রিয়তম, আমি তোমায় ভালোবাসি-
অপেক্ষায় আছি দখিনায় অনাদিকাল!
ইতি তোমার- চিঠি।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ছড়া : সাহিত্যের মাঠে সবচেয়ে দুরন্ত খেলোয়াড়
মুখোশ
লেখক-ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান আর নেই
বিশ্বের প্রথম ভার্চুয়াল ছড়া উৎসবে অংশ নিচ্ছেন যারা
সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী’র ৬০ তম জন্মদিন আজ
শিশুসাহিত্য পুরস্কারের জন্য পাণ্ডুলিপি আহবান করেছে ‘পাপড়ি’
Design & Developed BY PAPRHI-iT