Header Border

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) ২৮.৯৬°সে

শিশুসাহিত্যিক শাহ আলম বাদশার সাক্ষাৎকার

Spread the love

শাহ আলম বাদশা ৭০ দশকের কবি, ছড়াকার, গীতিকার বিশেষত; শিশুসাহিত্যিক। ৬টি প্রবন্ধ সংকলন, ৩টি গল্পসংকলন, ৩টি শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ, ২টি ছড়াগ্রন্থ, ৩টি কাব্যগ্রন্থ, ৭টি অডিও-ভিডিও এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭৭ সাল থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করছেন। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশ রংপুর কর্তৃক ‘উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ ছড়াকার’ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। ছড়াসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্যে ১৯৮৬ সালে পুরস্কৃত হয়েছেন ছড়াপরিষদ সিলেট থেকে। পেশায় উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা শাহ আলম বাদশা সাংবাদিকতার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন একসময়। এছাড়া বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন শাহ আলম বাদশা। সম্প্রতি দৈনিক জালালাবাদ-এর শিশু-কিশোর সাময়িকী সপ্তডিঙার বিভাগীয় সম্পাদক কামরুল আলমের মুখোমুখি হয়েছিলেন জনপ্রিয় এই শিশুসাহিত্যিক। দুজনের মধ্যকার কথোপকথন নি¤েœ উপস্থাপন করা হলো।

কেমন আছেন?
আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।

লেখালেখিতে কীভাবে এলেন?
লেখালেখিতে আসার ঘটনাটা খুবই কাকতালীয় এবং চমকপ্রদ। দেশস্বাধীনের পর তখন আমি স্কুলে পড়ি। তো আমার নানার বাড়ির এলাকা থেকে আমার মামার এক বন্ধু যিনি কমিউনিস্ট আন্দোলন করতেন, তিনি আমাদের বাড়িতে এসে ওঠেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন বিশাল সাইজের একটি খাতা, দেখতে আগের দিনের জমিরেজিস্ট্রি করার বড়োখাতার মতন। খাতাটি খুব যত্ন করে রাখতেন এবং কাউকে নাড়তে দিতেন না। তিনি আমাদের বাড়িতে প্রায় অনেকদিন ছিলেন। তিনি একদিন বাইরে বেরিয়ে গেলে আমি চুপ করে তার খাতাটি খুলে পড়তে থাকি। সেখানে খুব সুন্দর হাতের লেখা মজার-মজার ছড়া-কবিতা পড়ে বেশ আনন্দ পাই। ছড়া-কবিতা কাকে বলে কিছুই বুঝতাম না যদিও পাঠ্যের পদ্যের ভক্ত ছিলাম আমি। তখনই আমি মনে-মনে বলি যে, আমিও তো এরকম পদ্য লিখতেই পারি। অমনি প্রথম একটি ছড়া লিখে ফেলি। এখনও মনে আছে, চারপঙক্তি বলছি–
যেতে বললে বামে
চলেন তিনি ডানে
ডাকলে পেছন থেকে
শোনেন না যে কানে!

আপনার প্রথম লেখা কবে কোথায় প্রকাশিত হয়?
আমার প্রথম লেখা কবে কোথায় প্রকাশিত হয় ঠিক সেভাবে খেয়াল না থাকলেও ১৯৭৫ সালের দিকে লালমনিরহাট শহরে এবং স্কুল-কলেজ থেকে অনেক দেয়ালপত্রিকায় আমি লিখেছি। এরপর যতটুকু মনে পড়ে ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রেডিও বাংলাদেশের রংপুর থেকে ছোটোদের জন্য পরিচালিত ‘সবুজমেলা’ অনুষ্ঠানে আমার প্রথমছড়া পাঠ করা হয়। এরপর আমার প্রচুর ছড়া ঢাকা বেতারের কলকাকলী অনুষ্ঠানেও প্রচারিত হয়।

আর পত্রিকার কথা বললে কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত মাসিক শুভেচ্ছা পত্রিকায় আমার প্রথমলেখা ছাপা হয়, যার নাম ছিল ‘ছল-ছল-ছল’ বন্যার পানিকে নিয়ে লেখা ছড়া।

আপনার শৈশবকালের একটি মজার ঘটনা বলুন।
মজার ঘটনা তো অনেকই আছে। আমি শৈশবকালে অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করলেও তাদের মতো দুষ্টুমি করতাম না কিংবা অন্যদের জিনিস চুরি করা বা না বলে নেয়া ইত্যাদি কাজ করতাম না। তবে বন্ধুদের একদল আমাদের পাশের বিরাট রাইসমিলের খেজুররস চুরি করতো। একদিন আমার সেই বন্ধুরা আমাকে সাথে নিয়ে রাতে খেজুরগাছ থেকে রসভর্তি বেশ কয়টি কলসি নামিয়ে সবাই মজা করে রস খাবার পর সেই কলসিতে পুকুরের পানি ভরিয়ে একই জায়গায় বসিয়ে দেয়। আমার কাছে যা ছিল খুবই মজার। আমি রস খেয়েছি কিনা খেয়াল নেই।

ছোটোদের জন্যে কেন লিখেন?
আসলে ছোটোকাল থেকেই অর্থাৎ শিশুবয়স বা প্রাইমারি স্কুল থেকেই আমার লেখালেখির হাতেখড়ি। আর ছোটোমানুষ হিসেবে ছোটোদের মনমানস চিন্তা-চেতনা নিয়েই আমি তখন একমাত্র শিশুতোষ ছড়া-কবিতা লিখতাম। তাছাড়া আমাদের ক্লাসের বইয়ের পদ্যগুলোও ছোটোদের উদ্দেশ্য করে লেখা ছিল বলে ছড়াগুলো আমার খুব ভালো লাগতো। ছোটোকাল থেকে ছোটোদের নিয়ে লিখতে-লিখতে ছোটোদের মনমানসই আমাকে পেয়ে বসে। তাদের নিয়ে কি নিয়মিত লিখতে-লিখতে একসময় বড় হয়ে গেলাম, তখনও তাদের নিয়েই পত্রপত্রিকায় লিখে-লিখে মনের অজান্তেই আমি শিশুসাহিত্যিক হয়ে গেলাম। তাদের মনের কথা, তাদের চরিত্রগঠন ও নৈতিকতা নিয়ে ছান্দিক বিনোদন রচনা করতে আমার খুব ভাল্লাগে।

আপনাদের ছোটোবেলা আর এখনকার ছোটোবেলার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
ছোটোবেলায় শিক্ষিত-অশিক্ষিতনির্বিশেষে আমাদের পিতা-মাতারা আমাদের যেমন নৈতিকশিক্ষার জন্য মক্তবে পাঠাতেন তেমনই আমাদের দাদা-দাদি নানা-নানি, মা-বাবারা সুন্দর-সুন্দর ছড়াবৃত্তি করে কিংবা ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। নিজেরা কুরআনপাঠ করতেন, কেউ-কেউ সুর করে পুঁথিও পাঠ করতেন, ওয়াজ শুনতেন কখনো আমাদেরও সাথে নিতেন। পাঁচওয়াক্ত কিংবা জুম্মার নামাজেও সাথে নিয়ে গিয়ে নৈতিক ও আদবশিক্ষা দিতেন, যা এখন অকল্পনীয়। এসব দেখেশুনে আমরা সেভাবেই গড়ে উঠেছি। এরপর আমাদের পাঠ্যপুস্তকেও নৈতিকশিক্ষাসহ কুরআন ও চল্লিশটি হাদিসের শিক্ষার প্রভাব ছিল। স্কুলপাঠাগার, মসজিদপাঠাগার ব্যতীত তখন পাঠাগারের ব্যাপক প্রভাব ছিল। শিক্ষকদেরও নৈতিক মান ছিল উচ্চে এবং তাদের অব্যবসায়ীসুলভ মনোভাব ও আদর্শ আমাদের নাড়া দিতো। তাদের পিতৃসুলভ আচরণ ও পাঠদানের মুগ্ধতায় আমরাও শিক্ষকদের খুব সম্মান করতাম।
এখনকার পিতা-মাতারা যেমন আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যস্ত তেমনই তাদের সন্তানদের নৈতিকতা ও চরিত্রগঠনের জন্য তারা সন্তানদের আর মক্তবে পাঠান না। আবার পাঠ্যপুস্তকেও থাকে না কোনো চরিত্রগঠন এবং মানুষের মতো মানুষ হওয়ার মতো কোনো শিক্ষাও। শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের শিক্ষায় চাকরি রুজির ব্যবস্থা হলেও অন্তত মানুষ হওয়া যায় না। তাই আমাদের ছোটোবেলায় এবং এখনকার ছোটবেলার ফারাক আকাশপাতাল।

বর্তমান অনলাইন মিডিয়ার যুগে শিশু-কিশোররা বই পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এ বিষয়ে আমাদের করণীয় কী?
দুনিয়ার কোনোদেশেই আমাদের দেশের মতো উদ্দেশ্যবিহীন জগাখিচড়ীমূলক শিক্ষাব্যবস্থাও নেই, তেমনই জগাখিচুড়িমূলক হাজাররকমের বইয়ের বোঝাও নেই। ফলে আমরা না হতে পারি কোনো, গবেষক বা বিজ্ঞানী না হতে পারি কোনো নৈতিক প্রাণী। শুধু সার্টিফিকেটের পেছনে ছটাই হয়ে যায় আমাদের মূললক্ষ্য। এজন্যই আজ শিক্ষিতরাই সকল অপকর্ম-পাপের মূলহোতা। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অবশ্যই হতে হবে নৈতিক এবং কারিগরি শিক্ষামূলক।
এমনকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন পাঠ্য থাকা উচিত, যাতে করে আমাদের শিশুরা এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও মোবাইল কম্পিউটারের পাশাপাশি বই পড়তে বাধ্য হয়। কারণ বই না পড়লে ইতিহাস-ঐতিহ্যও জানা যায় না, নিজের অতীত-বর্তমানের সঙ্গে তুলনা করাও যায় না। মহামনীষীদের জীবনের আদর্শের ছোঁয়া নিজেদের জীবনেও লাগানো যায় না।
তাই আমাদের পাঠ্যসূচির সঙ্গে স্কুলপাঠাগারের বইপড়া বাধ্যতামূলক করা জরুরি। আমাদের সময়ে সেসন ফির সাথে পাঠাগারের চাঁদাও নেয়ার বদলে সত্যিকার অর্থে আমাদের বই পড়তে দেয়া হতো, আমরা স্কুলে বাড়তি বই পড়তাম এবং বাসায়ও এন্ট্রি করে নিয়ে যেতাম। আমাদের শিশুদের চরিত্র ও নৈতিকতা গঠনে আমাদের স্কুল-কলেজের পাঠাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সপ্তাহে বা মাসে নির্দিষ্ট কিছু গঠনমূলক বইপড়ার মাধ্যমে নম্বরপ্রাপ্তির শর্ত যুক্ত করতে হবে। এখন যেমন প্র্যাকটিক্যাল, হাতের কাজ, গার্হস্থ্য বা আঁকাআঁকি ইত্যাদি কাজেও নাম্বার দেয়া হয়, যা রেজাল্ট এর সঙ্গে যুক্ত হয়, ঠিক বইপড়ার বিষয়টিও নাম্বারযুক্ত করতে হবে। তাহলে বাচ্চা-কাচ্চারা বইপড়ায় অভ্যস্ত হবে। একবার বইপড়ায় অভ্যস্ত হলে, তাকে বইপড়া থেকে বিরত রাখার শক্তি কারো নেই।

দৈনিক পত্রিকার শিশুপাতা এবং শিশু-কিশোর পত্রিকাগেুলোর মান কেমন হওয়া উচিত?
দৈনিক-সাপ্তাহিক এবং শিশুকিশোর পত্রিকার পাতাগুলো গতানুগতিকতামুক্ত করে সৃজনশীল, গঠনমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। বলয় ও দলকানামুক্ত হওয়াও জরুরি।
সর্বোপরি শিশুকিশোরদের জন্য সুলিখিত লেখাই ছাপা হওয়া বাঞ্চনীয়। শিশুরাই জাতির আগামী দিনের কর্ণধার, এটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলে একজন যোগ্য সাহিত্যিকের হাতেই শিশুপাতার ভার তুলে দেয়াও জরুরি, যাতে ভুলেভরা লেখা পড়ে হাসতে না হয়।

শিশু-কিশোর পাঠক বন্ধুদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
শিশুকিশোরবন্ধুরা, লিখতে হলে আগে শিখতে হবে। ভালো লেখক ও পাঠক হতে হলে ভালো লেখকদের বই পড়তে হবে। একটি লেখা লেখার আগে দশটি উন্নত লেখা পড়লে নিজের লেখার মান এমনিতেই উন্নত হয়।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

Design & Developed BY PAPRHI-iT