Header Border

ঢাকা, শনিবার, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) ২১.৯৬°সে

বাংলাদেশের আমাজন রাতারগুল । কামরুল আলম

Spread the love

বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন সিলেটের ‘রাতারগুল’! অবাক হলেন? হ্যাঁ অবাক হবারই তো কথা। লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে থাকা এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা এভাবে কেউ করেনি যে! সুন্দরবনের কথা আমরা সকলেই জানি। সুন্দরবনও জলাবন। কিন্তু সেটি লোনা পানির জলাবন। আর সিলেটের রাতারগুল হলো বাংলাদেশের একমাত্র মিষ্টি পানির জলাবন। দেখতে সুন্দরবনের মতো হওয়ায় স্থানীয়ভাবে অনেকেই রাতারগুলকে ‘সিলেটের সুন্দরবন’ বলে উল্লেখ করেন। কেউ কেউ অবশ্য এ বনকে সিলেটের আমাজনও বলে থাকেন। শুধু সিলেটের কেন, এটা অবশ্যই বাংলাদেশের আমাজন। বিশ্বের যে কয়টি মিষ্টি পানির জলাবন রয়েছে রাতারগুল তার মধ্যে অন্যতম।

বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টিকে বিদায় জানিয়ে শরতের স্নিগ্ধ আবহাওয়ার ছোঁয়া এসেছে সবেমাত্র। এখনও আকাশে কালোমেঘের বিচরণ দেখে ছাতা হাতে নিয়েই ঘর থেকে বের হতে হয়! অবশ্য ছাতার বিকল্প ব্যবহারও দরকারি। শরতের আবহাওয়া মানেই এই রোদ এই বৃষ্টি! আর ছাতা হচ্ছে রোদ-বৃষ্টির ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ৩১ আগস্ট ২০১৮ সকালে সিলেট নগরীর বন্দরবাজারস্থ রংমহল টাওয়ারের নিচে সমবেত হলাম আমরা। সৃজনশীল প্রকাশনী সংস্থা পায়রা প্রকাশের উদ্যোগে ‘পায়রা এক্সপ্রেস’ নামক এই রাতারগুল ভ্রমণের যাত্রা শুরু হয় সকাল ১০টায়। সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকটবর্তী পর্যটনকেন্দ্র এই রাতারগুল। ভাবতেই অবাক লাগে, মাত্র কয়েক বছর আগে সন্ধান পাওয়া গেছে রাতারগুল নামক এই সুন্দরবনের। দু’টি মাইক্রো নিয়ে আমরা ছুটে চললাম রাতারগুলের উদ্দেশে। আমি যে গাড়িতে উঠলাম সেটাতে সহযাত্রী হিসেবে ছিলেন ‘পানসী’ গ্রুপের চেয়ারম্যান কবি আবুবকর সেতু, ঢাকার মেহমান-নওশাল নাটকে মীর সাব্বিরের বন্ধুর চরিত্রে অভিনয়কারী অভিনেতা ইকরামুল জয় ও তার সহধর্মিণী, হবিগঞ্জ থেকে আগত  কবি জয়নুল শামীম, রঙ প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্সের স্বত্বাধিকারী আহসান মাহমুদ, সংবাদকর্মী কামরুল আশিকী, গ্রাফিকস ডিজাইনার ও সাহিত্যকর্মী এমদাদ আলী, জালালাবাদ কবি ফোরামের সেক্রেটারি ও পায়রা এক্সপ্রেসের ব্যবস্থাপক কবি এম এ আসাদ চৌধুরী, পাপড়ি প্রকাশের ব্যবস্থাপনা সহযোগী ছড়াকার ফতহুল করিম হাসানসহ কয়েকজন তরুণ। গাড়িতেই জমে উঠলো অনানুষ্ঠানিক ছড়া-কবিতা পাঠের আসর। আমাজান২পানসী ইন ও পানসী রেস্টুরেন্টসহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা পানসী গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুবকর সেতু কথা প্রসঙ্গে জানালেন বিছনাকান্দির গল্প। বিছনাকান্দিও বর্তমানে সিলেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র কিন্তু কয়েক বছর আগেও লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল এই পিকনিক স্পট। কবি আবুবকর সেতু জানালেন, পানসী রেস্টুরেন্টে বিছনাকান্দির ছবি লাগানোতেই লোকজনের চোখে পড়ে প্রকৃতির নয়নাভিরাম এই দৃশ্য। তারপর ভিড় জমতে শুরু করে বিছনাকান্দিতে। রাতারগুল এবং বিছনাকান্দি দুটো পিকনিক স্পটে যাওয়ার রাস্তা খুব একটা উন্নত নয় বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাতায়াতের অনুপযোগী বললেও ভুল হবে না। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে আবিষ্কৃত হামহাম জলপ্রপাতের অবস্থা আরও করুণ। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সিলেট অঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি পড়লে দেশের পর্যটন খাতে সিলেট আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

যাই হোক, ছড়া-কবিতা পাঠ আর গল্প-আড্ডার মধ্য দিয়েই আমরা পৌঁছে গেলাম রাতারগুলের সন্নিকটে। সেখানে গাড়ি রেখে ডিঙি নৌকা ভাড়া করে প্রবেশ করলাম বনে। প্রতি নৌকায় ৫ জন করে যাওয়া যায়। আমি যে নৌকায় উঠলাম সেটাতে সহযাত্রী হিসেবে ছিলেন পায়রা প্রকাশের স্বত্বাধিকারী কবি সিদ্দিক আহমদ, কবি মিলন কান্তি দাশ ও তরুণ কবি সালেহ রাশেদ। হিসেব মতে একটি আসন খালি ছিল আমাদের নৌকায়। সে আসনটি মধ্যখানে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য পূরণ করে নেন কবি সাদেক হোসেন। তিনি খুব মজার মানুষ। চলন্ত নৌকায় মজাদার বিস্কুট সরবরাহ করে আমাদেরকে অবাক করে দেন। নৌকা যখন বনের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে তখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে পড়ি আমরা সকলে। নিজের অজান্তেই গুনগুনিয়ে গান গাইতে থাকি-তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর, না জানি তাহলে তুমি কত সুন্দর…।

বাংলাদেশের আমাজন বা সিলেটের সুন্দরবন বলে পরিচিত এই জলাবনের বৈশিষ্ট্য হলো বর্ষাকালে পুরো বনটাই পানিতে ডুবে যায়। কিন্তু বনের গাছগুলো পানিতে ডুবে মরে না, বরং আরও সতেজ-প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। গাছগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন পানিতেই তাদের আজন্ম বসবাস। প্রায় ২০ থেকে ৩০ ফুট পানির নিচে ডুবে থাকা গাছগুলোর আবার শিকড় ভেসে ওঠে পানির ওপরে। আমরা যখন বনে প্রবেশ করেছি তখন প্রচণ্ড রৌদ্র। বনের গভীরে গাছের ছায়ায় সে রৌদ্র অনেকটা আলো-আঁধারি খেলায় নিমজ্জিত হচ্ছিল। রাতারগুলের বনের মধ্য দিয়ে নৌকায় ভেসে বেড়ানোর সময় কী যে আনন্দ লাগছিল আমাদের তা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। বনে ঘুরে বেড়ানোর সময় আমাদের অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন জেগেছে এই জায়গাটির নাম ‘রাতারগুল’ হলো কিভাবে? খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম বনটিতে ‘রাতার’ নামের এক ধরনের গাছ রয়েছে যাতে গোল গোল মানে গোলাকৃতির ফল ধরে। এই ফলগুলো পাখিদের প্রিয় খাবার। সেই রাতার গাছের গোল ফল থেকেই এলাকাটির নামকরণ হয়েছে ‘রাতারগুল’।

আমাদের নৌকার পাশ দিয়েই যেতে দেখা গেল ছড়াকার তোরাব আল  হাবীবের নৌকাটিকে। তিনিও আমাদের সহযাত্রী, এসেছেন সপরিবারে। তাঁর নৌকায় একজন কণ্ঠশিল্পী দরাজ গলায় তখন গাইছিল- দে দে পাল তুলে দে, মাঝি হেলা করিস না, ছেড়ে দে নৌকা আমি যাবো মদিনা…। তোরাব আল হাবীব জানালেন শিল্পীর নাম জাহাঙ্গীর। আমরা তাঁর গান শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে ঘুরতে লাগলাম। নাম না জানা বিভিন্ন রকমের পাখির ডাক আমাদের কানে এসে বাজছিল বারবার। এ ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই, সুনসান নীরবতা। নৌকার মাঝির কাছ থেকে জানা গেল অনেক ধরনের পাখির অভয়ারণ্য এই বন। মাঝি বললো, ভাগ্য ভালো থাকলে ঈগল বা শকুনেরও দেখা পেতে পারেন।

আমাজান৫আমাজান৫আমি বললাম, এ আর এমন কী? তবে সাপ-টাপ থাকলে কিন্তু আমি নেই! সাপ দেখলেই গা শিউরে ওঠে। মাঝি মুচকি হেসে বললো, নানা প্রজাতির সাপ, কীট-পতঙ্গ এবং জোঁক রয়েছে এই বনে। তবে ভয় নেই, সাপ সাধারণত জনসম্মুখে আসে না। মাঝে মধ্যে গাছের ডালে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। আমরা কিছুটা ভয় পেয়ে গাছের ডালের দিকে তাকালাম। ভাগ্য ভালোই বলতে হয়, পুরো বনের কোথাও কোনো সাপের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেনি। তবে জোঁকের আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারিনি। বর্ষা শেষ হয়ে যাওয়াতে পানি কিছুটা কমে গেছে বিভিন্ন জায়গায়। এরকম এক জায়গায় আমাদের নৌকা আটকে যাওয়ায় পানিতে নেমে ঠেলা দিতে হচ্ছিল। আমিও নেমেছিলাম পানিতে। নৌকায় ওঠার পর দেখলাম মাঝারি সাইজের একটা জোঁক হাঁটুর নিচে কামড় দিয়ে বসে আছে। বাঁ হাত দিয়ে এক হ্যাঁচকা টানে ওকে ছুঁড়ে ফেললাম। কয়েকজন সহযাত্রী অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে। বললাম, ছোটোবেলা গ্রামেই ছিলাম। জোঁকের আক্রমণ তাই আমার কাছে নতুন কিছু নয়।

হিজল, করচ, তমাল, অর্জুন, কদম, জালিবেত, বনজাম, মুর্তা, পিটালি, জারুলসহ নানা জাতের গাছগাছালিতে সমৃদ্ধ সিলেটের এই সুন্দরবন। বনের গভীরে রয়েছে বানর, মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বন্যশূকর, বেজি, ভোঁদড়, বনবিড়াল, সাপ-বিচ্ছুসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণী। আছে পানকৌড়ি, চড়ুই, ঘুঘু, চিল, শকুন, বালিহাঁস, বকসহ নানা প্রজাতির পাখি। স্বচ্ছ নীলচে পানির ওপর ভাসমান জলাবনটি দেখে মনে হয় এ যেন সত্যিই আরেক সুন্দরবন। সবুজ অরণ্যের প্রতিচ্ছবি সংবলিত পানিতে ঘুরে বেড়ানোর সময় বারবার হৃদয়টি দুলে ওঠে। মহান আল্লাহ কত সুন্দর সাজিয়েছেন এই ধরণীকে। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ঘোরাঘুরি করে আমরা ফিরে আসি খেয়াঘাটে। খেয়াঘাটের পাশেই যাত্রীছাউনি। এখানে পরিবেশন করা হয় গরম গরম খাবার। সাদা ভাত, মুরগিভোনা ও মুরগির গোশত দিয়ে আলু এবং রোস্ট আকৃতির একপিস ভাজা মাছ। গতানুগতিক পিকনিক বা ভ্রমণে প্যাকেট বিরিয়ানির প্রচলন থাকলেও পায়রা এক্সপ্রেসের এই ব্যতিক্রমী খাবারের আয়োজন সবার ভালো লাগে।

বাংলাদেশের আমাজন কিংবা সিলেটের সুন্দরবন বলে পরিচিত এই রাতারগুল ভ্রমণে যেতে চাইলে অনেকেই বিড়ম্বনায় পড়তে পারেন। কারণ সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থানের কারণে কেউ কেউ ম্যাপ দেখে প্রথমে গোয়াইনঘাট চলে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে পথ একটু দীর্ঘ হবে এবং খরচও বাড়বে। তাই সহজে রাতারগুল যাওয়ার পথটি উল্লেখ করছি এখানে। সিলেট নগরীর আম্বারখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে ‘সাহেব বাজার’ হয়ে মোটরঘাট পৌঁছাতে হবে। সিএনজি রিজার্ভ নিলে ভাড়া পড়ে ২০০-৩০০ টাকার মতো। এরপর সরাসরি মোটরঘাট থেকে ডিঙি নৌকা ভাড়া নিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করা যায়। ঘণ্টাপ্রতি নৌকার ভাড়া পড়বে ২০০-৩০০ টাকার মতো কিংবা আলোচনা সাপেক্ষে। যাওয়ার আগে মনে রাখতে হবে বন বা এর আশপাশে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। খাবার হোটেলও নেই, তাই খাবার নিয়ে যেতে হবে সঙ্গে করে। বর্ষাকালেই রাতারগুল ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি আনন্দ। উপভোগ করা যায় সুন্দরবনের সৌন্দর্য। আমেজ পাওয়া যায় আমাজনের।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

বুনো ঝর্ণা হামহাম’র সন্ধানে । কামরুল আলম
Design & Developed BY PAPRHI-iT